
সোমবার দিনের শুরুতে বাজারের মনোভাব কিছুটা ইতিবাচক ছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্যবান্ধব পদক্ষেপ এবং সরকার পুনরায় চালু করার বিষয়ে সিনেটে প্রথম ভোট আশাবাদ বাড়িয়েছে। চীনের মূল্যস্ফীতির তথ্য, ব্যাংক অব জাপানের (BoJ) মন্তব্য, জাপানের প্রণোদনা দেওয়ার সম্ভাবনা এবং রিজার্ভ ব্যাংক অব অস্ট্রেলিয়ার (RBA) নরম নীতির ইঙ্গিতও বাজারের এই মনোভাবকে সমর্থন করেছে।
সরকার পুনরায় চালু করার লক্ষ্যে সিনেটে প্রথম ভোটে 60–40 ব্যবধানে প্রস্তাবটি পাস হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র সরকারের শাটডাউন শেষ হওয়ার কাছাকাছি বলে মনে হয়েছে। মধ্যপন্থী সিনেট ডেমোক্র্যাটরা 30 জানুয়ারি পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলোর অর্থায়নে একটি সাময়িক চুক্তিতে সম্মত হয়েছেন। এতে ফেডারেল কর্মীদের বকেয়া বেতন দেওয়া এবং রাজ্যগুলোতে অর্থ হস্তান্তর পুনর্বহালের বিষয়ও রয়েছে। কয়েকটি বিভাগ পুরো বছরের জন্য অর্থায়ন পাবে, তবে প্রতিনিধি পরিষদের ভোটে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় দলের পক্ষ থেকেই বাধা আসতে পারে। তারপরও, অন্তত আটজন ডেমোক্র্যাটের সমর্থন থাকায় সমাধানটি কাছাকাছি বলে মনে হচ্ছে। সিনেট পূর্বাঞ্চলীয় সময় রাত 8টায় আবার অধিবেশনে বসবে, এবং শিগগিরই প্রস্তাবটি পাস হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পরিবহনমন্ত্রী শন ডাফি সতর্ক করেছেন, থ্যাঙ্কসগিভিংয়ের আগে বিমান চলাচল প্রায় থমকে যেতে পারে। সপ্তাহের শেষ নাগাদ 4,000-এর বেশি ফ্লাইট বিলম্বিত বা বাতিল হওয়ার সংখ্যা বেড়ে 10%-এ পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অর্থনীতিবিদ বেসেন্ট ও হ্যাসেট বলেছেন, সরকারি কার্যক্রম বন্ধের অর্থনৈতিক ক্ষতি আরও বাড়ছে, ফলে মন্দার ঝুঁকিও বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তর (USTR) চীনের সামুদ্রিক পরিবহন, লজিস্টিকস ও জাহাজ নির্মাণ খাতে আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টা নিয়ে তাদের Section 301 তদন্ত এক বছরের জন্য স্থগিত করেছে। এই সিদ্ধান্ত 10 নভেম্বর 2025 থেকে কার্যকর হয়েছে। চীনও 2026 সালের শেষ দিক পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে গ্যালিয়াম, জার্মেনিয়াম, অ্যান্টিমনি ও সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ উপকরণের রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজের ওপর বিশেষ বন্দর ফি এক বছরের জন্য স্থগিত রেখেছে। ওয়াশিংটনের স্থগিতাদেশসহ এসব পদক্ষেপ বাণিজ্য সম্পর্কের উন্নতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তবে, CNN জানিয়েছে, স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যাচ্ছে 2020 সাল থেকে চীনের ক্ষেপণাস্ত্র মজুত বাড়ানোর গতি ত্বরান্বিত হয়েছে। এতে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
চীনের স্বর্ণভিত্তিক এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ডের (ETF) পরিমাণ 2025 সালের প্রথম 9 মাসে 164% বেড়েছে। এ সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক টানা 11তম মাসের মতো সোনা কেনা অব্যাহত রাখায় রিজার্ভ বেড়ে 2,303.5 টনে দাঁড়িয়েছে। উৎপাদন বছরওয়ারি 3.6% বাড়লেও, গয়নার চাহিদা দুর্বল থাকা এবং পরিবারগুলোর সতর্ক ব্যয়ের কারণে ব্যবহার 7.9% কমে 682.7 টনে নেমেছে।
চীনের অক্টোবরের মূল্যস্ফীতির তথ্যে সামান্য উন্নতি দেখা গেছে। Consumer Price Index (CPI) বছরওয়ারি ও মাসওয়ারি 0.2% বেড়েছে, যা 0.0% প্রত্যাশার চেয়ে বেশি। অন্যদিকে, Producer Price Index (PPI) বছরওয়ারি 2.1% কমেছে, যা প্রত্যাশিত -2.2%-এর তুলনায় সামান্য ভালো। CPI এখনও ডিফ্লেশনের কাছাকাছি রয়েছে, আর উৎপাদকদের দাম টানা 37 মাস ধরে কমেছে—যা ধীরগতির পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দেয়।
BoJ-এর অক্টোবরের সভার সারাংশে মজুরি বৃদ্ধির গতি নিয়ে নীতিনির্ধারকদের আস্থা বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকলে বেশির ভাগ নীতিনির্ধারক নিকট ভবিষ্যতে সুদের হার বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছেন। দুই সদস্য অবিলম্বে হার বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন, আর গভর্নর কাজুও উয়েদা ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিয়েছেন। BoJ-এর নীতিনির্ধারণী পর্ষদের সদস্য জুনকো নাকাগাওয়া বলেছেন, অর্থনীতি ও মূল্যস্তরের উন্নতি হলে ব্যাংকটি সুদের হার বাড়াতে থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। টেকসই মূল্যস্ফীতির প্রবণতা নিশ্চিত করতে তিনি তথ্যনির্ভর পদ্ধতির ওপর জোর দিয়েছেন।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বলেছেন, সরকার 2025 অর্থবছরের প্রাথমিক বাজেট ভারসাম্যের লক্ষ্য বজায় রাখবে, তবে দীর্ঘমেয়াদি রাজস্বনীতির জন্য নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারে। তিনি এখনই বিক্রয় কর কমানোর সম্ভাবনা নাকচ করেছেন, তবে ভবিষ্যতে এমন পদক্ষেপের সুযোগ উড়িয়ে দেননি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যেকোনো পরিবর্তন মজুরি ও মুদ্রাস্ফীতির ওপর নির্ভর করবে। জাপানের আর্থিক ব্যবস্থার প্রতি বাজারের আস্থা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি প্রবৃদ্ধিতে সহায়তার জন্য সরকার উল্লেখযোগ্য প্রণোদনা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
যুক্তরাজ্যে, Chartered Institute of Personnel and Development (CIPD)-এর এক জরিপে দেখা গেছে, নিয়োগকর্তারা আগামী বছর বেতন 3% বাড়বে বলে আশা করছেন। তবে প্রতি ছয়টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি মনে করছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) গ্রহণের ফলে চাকরি কমতে পারে। নিয়োগের গতি এখনও ধীর, আর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো সরকারকে নতুন কর এড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছে, কারণ তা কর্মী নিয়োগে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
RBA-এর ডেপুটি গভর্নর Andrew Hauser বলেছেন, অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য অস্ট্রেলিয়ার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিকের তুলনায় এখনও বেশি কঠোর, ফলে নীতি আরও শিথিল করার সুযোগ সীমিত। তিনি জোর দিয়ে বলেন, আউটপুট গ্যাপ সংকুচিত না হওয়া পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি কঠোর রাখতে হবে। সরবরাহ বাড়াতে উৎপাদনশীলতা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির আহ্বান জানান তিনি। তবে ভবিষ্যতে সুদের হার কমানো এখনও সম্ভব বলেও উল্লেখ করেন।
তিন সপ্তাহের মধ্যে প্রথম সাপ্তাহিক পতনের পর U.S. Dollar Index (DXY) টানা তিন দিনের দরপতন থামিয়েছে, তবে ঘুরে দাঁড়ানোর গতি ছিল না। Gold দুই সপ্তাহের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, আর USDJPY ও AUDUSD টানা দ্বিতীয় দিনে বেড়েছে। EURUSD ও GBPUSD-এর টানা তিন দিনের উত্থান থেমেছে, NZDUSD সাত মাসের সর্বনিম্ন পর্যায় থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং USDCAD টানা দ্বিতীয় সেশনে কমেছে। WTI Crude Oil, Bitcoin (BTC) ও Ethereum (ETH)—সবগুলোরই টানা দ্বিতীয় দিনে দর বেড়েছে।
শুক্রবারের পুনরুদ্ধারের ধারা USDJPY বজায় রেখেছে, যদিও ব্যাংক অব জাপানের (BoJ) অক্টোবরের বৈঠকের সারসংক্ষেপে কিছুটা কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দেখা গেছে। ইয়েনের এই ওঠানামার পেছনে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আরও প্রণোদনার ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য এবং মার্কিন সরকার আবার চালু হওয়া ও যুক্তরাষ্ট্র-চীনের বাণিজ্য সম্পর্কের উন্নতির প্রত্যাশা থেকে তৈরি সামগ্রিক আশাবাদ কাজ করে থাকতে পারে।
বাজারের মনোভাব উন্নত হলেও EURUSD ও GBPUSD-এর টানা তিন দিনের ঊর্ধ্বগতি থেমেছে। এর আগে পেয়ার দুটি তিন সপ্তাহের মধ্যে প্রথম সাপ্তাহিক দরবৃদ্ধি দেখিয়েছিল। গতি সীমিত থাকা সত্ত্বেও USD চার সেশনের মধ্যে প্রথম দৈনিক দরবৃদ্ধি রেকর্ড করেছে। ইউরোপের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, যুক্তরাজ্যের দুর্বল কর্মসংস্থানের তথ্য এবং 26 নভেম্বরের ব্রিটিশ বাজেটের আগে সতর্কতাও পেয়ার দুটির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।



বাজারের মনোভাব ইতিবাচক থাকায়, চীনের আশাব্যঞ্জক তথ্য ও খবরের সহায়তায় অস্ট্রেলিয়ান ও নিউজিল্যান্ড ডলারের মতো ঝুঁকি-সংবেদনশীল মুদ্রাগুলো সমর্থন পাচ্ছে। RBA-র ডেপুটি গভর্নর Andrew Hauser-এর ডোভিশ মন্তব্য সত্ত্বেও AUDUSD টানা দ্বিতীয় দিনে বেড়েছে। অন্যদিকে, NZDUSD এপ্রিলের শুরুর পর সর্বনিম্ন স্তর থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে টানা দুই দিনের পতনের ধারা শেষ করেছে। ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা বাড়া এবং কানাডার প্রধান রপ্তানি পণ্য অপরিশোধিত তেলের দাম ঘুরে দাঁড়ানোর মধ্যে USDCAD টানা দ্বিতীয় সেশনে কমেছে।
বাজারের সতর্ক আশাবাদে সোনার দাম দুই সপ্তাহের সর্বোচ্চে উঠেছে এবং টানা চতুর্থ দিনের মতো বেড়েছে, যদিও USD কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম বড় ক্রেতা চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ETF-গুলোর জোরালো চাহিদার ইঙ্গিত দেওয়া সোনা-সম্পর্কিত তথ্যও মূল্যবান ধাতুটিকে আরও শক্তি জোগাতে পারে।
অন্যদিকে, কমতে থাকা আশঙ্কা এবং উত্তেজনা প্রশমিত হলে জ্বালানির চাহিদা বাড়তে পারে—এমন প্রত্যাশার মধ্যে অপরিশোধিত তেলও শুক্রবারের পুনরুদ্ধার অব্যাহত রেখেছে। তবে OPEC+ পদক্ষেপ সত্ত্বেও সামনে থাকা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা সরবরাহের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
দুই সপ্তাহের দরপতনের পর বাজারের ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের শেয়ারবাজারে সাম্প্রতিক উত্থানের সমর্থনে Bitcoin (BTC) ও Ethereum (ETH) টানা দ্বিতীয় দিনের মতো বেড়েছে।
সোমবারের বাজারে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটতে পারে, কারণ মার্কিন ট্রেডাররা ইতিহাসের দীর্ঘতম সরকারি শাটডাউন শেষ করার লক্ষ্যে রাজনৈতিক অগ্রগতির দিকে নজর রাখবেন। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্যকে সহায়তা করে এমন সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোতে বাজারের প্রতিক্রিয়াও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। এসব কারণে USDJPY, AUDUSD, ইকুইটি ও ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো ঝুঁকিপূর্ণ অ্যাসেটের দাম আরও বাড়তে পারে। তবে মিশ্র সংকেতের মধ্যে সোনার দর শক্ত থাকতে পারে। মার্কিন নীতিনির্ধারকেরা প্রতিনিধি পরিষদের সম্ভাব্য বাধা অতিক্রম করতে পারলে, নতুন করে আশাবাদ এবং ওয়ারেন বাফেটের বিদায়ী চিঠির প্রতি মনোযোগ ওয়াল স্ট্রিটের দর বাড়াতে সহায়তা করতে পারে। তবে কোনো ধাক্কা এলে বাজারের মনোভাব দ্রুত দুর্বল হতে পারে, তাই ট্রেডারদের সতর্ক থাকা উচিত। সরকার পুনরায় চালু হলে জমে থাকা মার্কিন অর্থনৈতিক ডেটাও প্রকাশিত হবে। এতে ডিসেম্বরে ফেডারেল রিজার্ভের সম্ভাব্য সুদের হার কমানোর পূর্বাভাস আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে; এর আগে এই সম্ভাবনা USD-কে সমর্থন দিয়েছিল।
ট্রেডিংয়ে ভাগ্য আপনার সহায় হোক!